রংধনু কীভাবে তৈরি হয়?
বৃষ্টির পর আকাশে হঠাৎ দেখা গেল বিশাল এক রঙিন বাঁক- বেগুনি, নীল, আসমানি, সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল (বেনীআসহকলা) । প্রকৃতির এই সুন্দর দৃশ্যের নামই রংধনু বা রেইনবো (Rainbow)
কিন্তু প্রশ্ন হলো-
- রংধনু কীভাবে তৈরি হয়?
- আকাশে এতগুলো রং আসে কোথা থেকে?
এর পেছনে রয়েছে সূর্যের আলো এবং বৃষ্টির পানির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফোঁটার চমৎকার বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক।
রংধনু তৈরির জন্য কী কী দরকার?
রংধনু দেখতে সাধারণত তিনটি জিনিস প্রয়োজন–
- সূর্যের আলো
- বাতাসে থাকা পানির ফোঁটা
- সঠিক অবস্থান বা কোণ (Angle)
সাধারণত বৃষ্টির পর বাতাসে অসংখ্য ক্ষুদ্র জলকণা ভাসতে থাকে। একই সময়ে সূর্যের আলো যদি সেই জলকণার ওপর নির্দিষ্ট কোণে পড়ে, তাহলে রংধনু দেখা যেতে পারে।
সূর্যের আলোতে এত রং আছে?
হ্যাঁ।
আমাদের চোখে সূর্যের আলো সাদা মনে হলেও এটি আসলে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর সমন্বয়। দৃশ্যমান আলোর মধ্যে রয়েছে লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল, আসমানি ও বেগুনিসহ বিভিন্ন রং।
রংধনু তৈরির সময় এই বিভিন্ন রঙের আলো আলাদা হয়ে আমাদের চোখে পৌঁছায়।
একটি পানির ফোঁটার মধ্যে কী ঘটে?
রংধনু তৈরির মূল রহস্য এখানেই।
১. আলো পানির ফোঁটায় প্রবেশ করে
সূর্যের আলো যখন বাতাস থেকে পানির ফোঁটার মধ্যে প্রবেশ করে, তখন আলোর গতিপথ কিছুটা পরিবর্তিত হয়। একে বলা হয় প্রতিসরণ (Refraction)।
২. সাদা আলো বিভিন্ন রঙে আলাদা হয়
পানির ফোঁটার ভেতরে প্রবেশের সময় বিভিন্ন রঙের আলো একইভাবে বাঁক নেয় না। ফলে সাদা আলো তার বিভিন্ন রঙের উপাদানে কিছুটা আলাদা হয়ে যায়। এই ঘটনাকে বলা হয় বিচ্ছুরণ (Dispersion)।

AI generated symbolic image
৩. আলো ফোঁটার ভেতরের পৃষ্ঠ থেকে প্রতিফলিত হয়
আলোর একটি অংশ পানির ফোঁটার ভেতরের পৃষ্ঠে গিয়ে প্রতিফলিত হয়। অর্থাৎ আলো ফোঁটার ভেতর থেকে আবার ফিরে আসে।
৪. আলো ফোঁটা থেকে বের হওয়ার সময় আবার বাঁকে
এরপর আলো যখন পানির ফোঁটা থেকে বাতাসে ফিরে আসে, তখন আবার প্রতিসরণ ঘটে।
এই পুরো প্রক্রিয়ার ফলে বিভিন্ন রঙের আলো ভিন্ন ভিন্ন কোণে আমাদের চোখে পৌঁছাতে পারে।
এইভাবেই অসংখ্য পানির ফোঁটা একসঙ্গে কাজ করে আমাদের চোখে রংধনুর সৃষ্টি করে।
রংধনুতে সাতটি রং কেন দেখা যায়?
প্রচলিতভাবে রংধনুর সাতটি রং বলা হয়-
লাল → কমলা → হলুদ → সবুজ → নীল → আসমানি → বেগুনি
তবে প্রকৃতিতে রংধনুর রংগুলো এমন কঠোরভাবে সাতটি আলাদা ভাগে বিভক্ত নয়। দৃশ্যমান আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্য ধীরে ধীরে এক রং থেকে অন্য রঙে পরিবর্তিত হয়।
অর্থাৎ, রংধনুতে আমরা যে সাতটি প্রধান রং বলি, তার মাঝেও অনেক সূক্ষ্ম রঙের পার্থক্য রয়েছে।
রংধনু সাধারণত বৃষ্টির পর দেখা যায় কেন?
বৃষ্টির পর বাতাসে প্রচুর ক্ষুদ্র জলকণা থাকতে পারে। সূর্যের আলো যখন এই জলকণার ওপর সঠিক কোণে পড়ে, তখন রংধনু তৈরির উপযুক্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়।
তাই বৃষ্টির পর সূর্য বের হলে রংধনু দেখার সম্ভাবনা বেশি। তবে শুধু বৃষ্টির পরই রংধনু হতে হবে এমন নয়। ঝরনা, জলপ্রপাত বা পানির সূক্ষ্ম কণার কাছেও উপযুক্ত আলো থাকলে রংধনু দেখা যেতে পারে।
রংধনু দেখতে হলে সূর্য কোথায় থাকা দরকার?
সাধারণত রংধনু দেখার সময় সূর্যকে আপনার পেছনের দিকে থাকতে হয় এবং সামনে থাকা বৃষ্টির বা পানির ফোঁটাগুলো সূর্যের আলো গ্রহণ করে।
এই কারণেই বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে সূর্য যদি আপনার পেছনে থাকে, তখন রংধনু দেখার সম্ভাবনা থাকে।
রংধনু কি আসলে গোল?
আমরা সাধারণত আকাশে রংধনুকে বাঁকা অর্ধবৃত্তের মতো দেখি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রংধনুর আকৃতি একটি পূর্ণ বৃত্তের অংশ।
মাটি থেকে আমরা সাধারণত বৃত্তের নিচের অংশ দেখতে পাই না। তবে উঁচু জায়গা থেকে, যেমন বিমানে থাকলে, কখনো কখনো রংধনুর অনেক বেশি অংশ এমনকি প্রায় পূর্ণ বৃত্তও দেখা সম্ভব।
রংধনুর কাছে গেলে কি তাকে ছোঁয়া যাবে?
না।
রংধনু কোনো বাস্তব বস্তু বা নির্দিষ্ট জায়গায় থাকা রঙিন দেয়াল নয়। নির্দিষ্ট অবস্থান থেকে সূর্যের আলো ও জলকণার মধ্যে আলোর ক্রিয়ার কারণে এটি আমাদের চোখে একটি দৃশ্য হিসেবে দেখা যায়। তাই আপনি যতই রংধনুর দিকে এগিয়ে যান, সেটিকে ধরে বা ছুঁয়ে ফেলা সম্ভব নয়।
রংধনু কি সবসময় একই রকম দেখা যায়?
না।
রংধনুর আকার, উজ্জ্বলতা ও অবস্থান নির্ভর করে সূর্যের অবস্থান, জলকণার আকার এবং পর্যবেক্ষকের অবস্থানের ওপর।
কখনো রংধনু খুব উজ্জ্বল হয়, আবার কখনো খুব হালকা দেখা যায়।
কিছু ক্ষেত্রে প্রধান রংধনুর বাইরে আরেকটি অপেক্ষাকৃত ফিকে রংধনুও দেখা যায়। এটিকে দ্বিতীয় রংধনু (Double Rainbow) বলা হয়।
এক কথায় উত্তর
সূর্যের আলো বৃষ্টির ক্ষুদ্র জলকণায় প্রবেশ করার সময় প্রতিসরণ ও বিচ্ছুরণের মাধ্যমে বিভিন্ন রঙে আলাদা হয়, জলকণার ভেতরে প্রতিফলিত হয় এবং বের হওয়ার সময় আবার প্রতিসৃত হয়ে আমাদের চোখে পৌঁছায়। অসংখ্য জলকণার এই সম্মিলিত আলোকক্রিয়ার ফলেই আমরা রংধনু দেখতে পাই।
🌈 জানো কি?
রংধনু দেখার অভিজ্ঞতা প্রত্যেক মানুষের জন্য সামান্য আলাদা হতে পারে। কারণ তুমি যে জলকণাগুলো থেকে আলো দেখছ, অন্য একজনের অবস্থান বদলে গেলে তার চোখে পৌঁছানো আলোর কণাগুলোও বদলে যেতে পারে।
আরও পড়ুন
• মেঘ আকাশে ভেসে থাকে কীভাবে?
• আকাশ নীল কেন?
• সূর্যাস্তের সময় আকাশ লাল হয় কেন?
JanaOjana — জানুন, ভাবুন, আরও কৌতূহলী হোন।
FAQs
সূর্যের আলো বৃষ্টির ক্ষুদ্র জলকণায় প্রবেশ করে প্রতিসরণ, বিচ্ছুরণ ও অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন রঙে আলাদা হয়ে আমাদের চোখে পৌঁছালে রংধনু দেখা যায়।
প্রচলিতভাবে দৃশ্যমান আলোর সাতটি প্রধান রংকে রংধনুর সাত রং বলা হয়। বাস্তবে রংগুলো ধারাবাহিকভাবে একটির সঙ্গে আরেকটি মিশে থাকে।
সাধারণত সূর্যের আলো এবং বাতাসে থাকা জলকণা একসঙ্গে থাকলে এবং সূর্য, জলকণা ও পর্যবেক্ষকের অবস্থান উপযুক্ত হলে রংধনু দেখা যায়।
হ্যাঁ। রংধনু মূলত একটি পূর্ণ বৃত্তের অংশ। মাটি থেকে সাধারণত তার ওপরের অংশই দেখা যায়।
না। এটি কোনো নির্দিষ্ট বস্তু নয়; নির্দিষ্ট অবস্থান থেকে আলো ও জলকণার মিথস্ক্রিয়ার ফলে তৈরি একটি দৃশ্যমান আলোক-প্রতিবিম্ব।
