how does rain form janaojana
|

বৃষ্টি কীভাবে তৈরি হয়? How Does Rain Form?

বৃষ্টি কীভাবে তৈরি হয়? সহজ ভাষায় জানুন বৈজ্ঞানিক কারণ –

বৃষ্টি আমাদের কাছে খুবই পরিচিত একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। আকাশে মেঘ জমে, কিছুক্ষণ পর ঝরঝর করে পানি পড়তে শুরু করে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই পানি আসলে আসে কোথা থেকে? মেঘের ভেতরেই কি পানি তৈরি হয়? আর এত পানি কীভাবে আকাশ থেকে মাটিতে পড়ে?

এর পেছনে রয়েছে পৃথিবীর একটি বিশাল প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যাকে বলা হয় জলচক্র (Water Cycle)

সহজভাবে বললে, সূর্যের তাপে পৃথিবীর পানি বাষ্প হয়ে ওপরে ওঠে, ঠান্ডা হয়ে ক্ষুদ্র জলকণায় পরিণত হয়, মেঘ তৈরি করে এবং সেই জলকণাগুলো বড় ও ভারী হয়ে গেলে বৃষ্টি হিসেবে মাটিতে ফিরে আসে।

বৃষ্টি কীভাবে তৈরি হয়?

বৃষ্টি তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে বোঝা যায়। পানি → জলীয়বাষ্প → মেঘ → জলকণা বড় হওয়া → বৃষ্টি

বৃষ্টি কীভাবে তৈরি হয়

এখন ধাপে ধাপে দেখা যাক।

১. সূর্যের তাপে পানি বাষ্প হয়ে যায়

পৃথিবীর সমুদ্র, নদী, হ্রদ, পুকুর এবং মাটিতে থাকা পানির ওপর সূর্যের তাপ পড়ে। তাপে পানির একটি অংশ তরল অবস্থা থেকে জলীয়বাষ্পে পরিণত হয়। এই জলীয়বাষ্প বাতাসের সঙ্গে মিশে ওপরের দিকে উঠতে থাকে।

শুধু সমুদ্র বা নদীর পানিই নয়, গাছপালা থেকেও বাতাসে জলীয়বাষ্প যায়। উদ্ভিদের পাতার মাধ্যমে পানি বাষ্প আকারে বের হওয়ার এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় বাষ্পমোচন। অর্থাৎ, মেঘ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পানির বড় একটি অংশ পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকেই আসে।

২. জলীয়বাষ্প ওপরে উঠে ঠান্ডা হয়

উচ্চতার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণত বায়ুর তাপমাত্রা কমে। ফলে ওপরে ওঠা জলীয়বাষ্প ধীরে ধীরে ঠান্ডা হতে থাকে। কিন্তু শুধু ঠান্ডা হলেই সরাসরি বৃষ্টির ফোঁটা তৈরি হয় না। বাতাসে থাকা অতি ক্ষুদ্র ধূলিকণা, লবণের কণা বা অন্যান্য ক্ষুদ্র কণার চারপাশে জলীয়বাষ্প জমে ছোট ছোট জলকণা তৈরি করতে পারে। এই ক্ষুদ্র জলকণা ও বরফকণাগুলো একসঙ্গে জমে মেঘ তৈরি করে।

৩. মেঘের ভেতর ক্ষুদ্র জলকণা তৈরি হয়

একটি মেঘকে তুলোর মতো বড় একটি পানির পিণ্ড ভাবলে ভুল হবে। মেঘের ভেতরে থাকে অসংখ্য অত্যন্ত ক্ষুদ্র জলকণা ও বরফের স্ফটিক, যেগুলো বাতাসে ভেসে থাকে। এগুলো এত ছোট যে বাতাসের ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহ তাদের কিছু সময় ধরে ভাসিয়ে রাখতে পারে।

তবে মেঘের ভেতরের গল্প এখানেই শেষ নয়।

৪. জলকণাগুলো একে অপরের সঙ্গে মিলতে থাকে

মেঘের ভেতরে থাকা ক্ষুদ্র জলকণাগুলো ক্রমাগত নড়াচড়া করে এবং একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। কিছু ক্ষেত্রে ছোট জলকণা একত্র হয়ে তুলনামূলক বড় জলকণায় পরিণত হয়। বিশেষ করে উষ্ণ মেঘে জলকণাগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ ও একীভবনের মাধ্যমে বড় ফোঁটা তৈরি হতে পারে। ঠান্ডা মেঘে বরফকণা ও জলকণার পারস্পরিক পরিবর্তনের মাধ্যমেও বৃষ্টির ফোঁটা তৈরির প্রক্রিয়া ঘটতে পারে।

৫. জলকণা ভারী হয়ে গেলে নিচে পড়তে শুরু করে

মেঘের ভেতরে জলকণাগুলো যত বড় হয়, তাদের ওজনও তত বাড়ে। একসময় জলকণাগুলোকে বাতাসের ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহ আর যথেষ্ট পরিমাণে ভাসিয়ে রাখতে পারে না। তখন মাধ্যাকর্ষণের কারণে তারা নিচের দিকে পড়তে শুরু করে।

এই জলকণাগুলো যখন বৃষ্টির ফোঁটা হিসেবে মাটিতে পৌঁছে, তখন আমরা তাকে বৃষ্টি বলি।

তাহলে মেঘ নিজে থেকে পানি তৈরি করে?

না। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

মেঘ পানি তৈরি করে না। পৃথিবীর পৃষ্ঠের পানি সূর্যের তাপে বাষ্পীভূত হয়ে জলীয়বাষ্পে পরিণত হয়। সেই জলীয়বাষ্প ওপরে গিয়ে ঠান্ডা হয়ে ক্ষুদ্র জলকণা বা বরফকণায় পরিণত হয় এবং মেঘ তৈরি করে। পরে সেই জলকণাগুলো বড় হয়ে বৃষ্টি হিসেবে পৃথিবীতে ফিরে আসে।

অর্থাৎ, বৃষ্টির পানি মূলত পৃথিবীর পানিরই একটি অংশ, যা জলচক্রের মাধ্যমে বারবার স্থান পরিবর্তন করে।

সব মেঘ থেকে কি বৃষ্টি হয়?

না।

আকাশে যে মেঘ দেখা যায়, তার প্রতিটি থেকেই বৃষ্টি নামবে, এমন নয়। কোনো মেঘে জলকণা খুব ছোট থাকলে সেগুলো বাতাসে ভেসে থাকতে পারে। আবার মেঘের ভেতরের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ুপ্রবাহ এবং জলকণা বা বরফকণার বৈশিষ্ট্যের ওপরও বৃষ্টির সম্ভাবনা নির্ভর করে। তাই অনেক সময় আকাশে ঘন মেঘ থাকলেও বৃষ্টি হয় না।

বৃষ্টির ফোঁটা কি মেঘ থেকে সরাসরি পড়ে?

বৃষ্টির ফোঁটা মেঘে তৈরি হয়ে নিচে নামতে শুরু করে। কিন্তু মাটিতে পৌঁছানোর পথে তার আকার ও গতি পরিবর্তিত হতে পারে।

খুব শুষ্ক পরিবেশে ছোট জলকণা মাটিতে পৌঁছানোর আগেই বাষ্পীভূত হয়ে যেতে পারে। আবার অনুকূল পরিস্থিতিতে ফোঁটাগুলো মাটিতে পৌঁছে বৃষ্টি তৈরি করে।

বৃষ্টি আসলে জলচক্রের অংশ

বৃষ্টি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি পৃথিবীর জলচক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। একটি সহজ চক্র এভাবে ভাবতে পারেন:

সমুদ্র/নদী/হ্রদ → বাষ্পীভবন → জলীয়বাষ্প → মেঘ → বৃষ্টি → নদী ও ভূ-পৃষ্ঠের পানি → আবার বাষ্পীভবন

এই প্রক্রিয়া বছরের পর বছর চলতে থাকে। এই কারণেই পৃথিবীর পানি একটি বিশাল প্রাকৃতিক চক্রের মধ্যে ঘুরতে থাকে।

বৃষ্টি কেন আমাদের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ?

বৃষ্টি শুধু রাস্তা ভেজায় বা গরম কমায় না। পৃথিবীর জীবনের জন্য এর গুরুত্ব অনেক বেশি।

বৃষ্টির পানি –

  • নদী, হ্রদ ও জলাশয় পূরণে সাহায্য করে
  • ভূগর্ভস্থ পানির মজুত পুনরায় পূরণে ভূমিকা রাখে
  • কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ করে
  • গাছপালা ও অন্যান্য জীবের পানির চাহিদা পূরণে সাহায্য করে
  • পৃথিবীর জলচক্র সচল রাখে

বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে বৃষ্টির গুরুত্ব আরও বেশি।

মজার তথ্য: সব বৃষ্টির ফোঁটা কি একই রকম?

না। বৃষ্টির ফোঁটার আকার বিভিন্ন হতে পারে। খুব ছোট ফোঁটা থেকে শুরু করে তুলনামূলক বড় ফোঁটা পর্যন্ত দেখা যায়।

আর একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, বৃষ্টির ফোঁটা সবসময় চোখের পানির ফোঁটার মতো আকৃতির হয়। আসলে বড় বৃষ্টির ফোঁটা বাতাসের মধ্য দিয়ে পড়ার সময় এর আকৃতি পরিবর্তিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো নিচের দিকে কিছুটা চ্যাপ্টা বা গোলাকার-চ্যাপ্টা আকৃতি ধারণ করে।

এক কথায় বৃষ্টি কীভাবে তৈরি হয়?

সূর্যের তাপে পৃথিবীর পানি বাষ্প হয়ে ওপরে ওঠে → জলীয়বাষ্প ঠান্ডা হয়ে ক্ষুদ্র জলকণা বা বরফকণা তৈরি করে → মেঘ তৈরি হয় → জলকণাগুলো বড় ও ভারী হয় → মাধ্যাকর্ষণের কারণে নিচে পড়ে → বৃষ্টি হয়।

এই পুরো প্রক্রিয়াটিই পৃথিবীর জলচক্রের একটি অংশ।

আরও পড়ুন

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. বৃষ্টি কীভাবে তৈরি হয়?

সূর্যের তাপে পানি বাষ্প হয়ে ওপরে ওঠে। জলীয়বাষ্প ঠান্ডা হয়ে মেঘের মধ্যে ক্ষুদ্র জলকণা বা বরফকণা তৈরি করে। এগুলো বড় ও ভারী হলে মাধ্যাকর্ষণের কারণে নিচে পড়ে এবং বৃষ্টি হয়।

২. বৃষ্টির পানি কোথা থেকে আসে?

বৃষ্টির পানি মূলত সমুদ্র, নদী, হ্রদ, পুকুর, মাটি ও উদ্ভিদ থেকে বাষ্পীভূত হওয়া পানিরই অংশ।

৩. সব মেঘ থেকে বৃষ্টি হয় কি?

না। সব মেঘে পর্যাপ্ত পরিমাণে বড় জলকণা তৈরি হয় না। তাই অনেক মেঘ বৃষ্টি না দিয়েই চলে যায়।

৪. মেঘে পানি কীভাবে জমে?

জলীয়বাষ্প ঠান্ডা হয়ে বাতাসে থাকা ক্ষুদ্র কণা বা বরফকণার চারপাশে জমে ক্ষুদ্র জলকণা তৈরি করতে পারে। অসংখ্য এমন কণা মিলে মেঘ তৈরি হয়।

৫. মেঘ এত ভারী হয়েও আকাশে ভেসে থাকে কীভাবে?

মেঘের পানি খুব ছোট ছোট জলকণা ও বরফকণা হিসেবে ছড়িয়ে থাকে। এগুলোর ওপর বাতাসের গতিবিধির প্রভাব থাকে। যখন কণাগুলো যথেষ্ট বড় ও ভারী হয়ে যায়, তখন বৃষ্টি হিসেবে নিচে পড়তে শুরু করে।

৬. বৃষ্টি না হলে কী হয়?

বৃষ্টি কম হলে মাটি, নদী, জলাশয় ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর প্রভাব পড়তে পারে। দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হলে খরা পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।

You May Like